লােভের পরিণাম গল্প

লােভের পরিণামঃ সংকেত-সূত্র নিজন প্রাপ্তরে দ্রুতগতি ব্রায়ণের গতিভঙ্গঅদূরে অরণ্যে দুটি সােনার বালা হাতে বাঘ—ব্রাহাণকে বালা দুটি দান করে বাঘ তার উপবাসব্রত ভঙ্গ করতে চায় ব্রাহ্মণের যুগপৎ লােভ ও ভয়—বাঘের অনুরােধ ও আশ্বাস-লােভে বশীভূত ব্রাহ্নণের প্রাণনাশ।

লােভের পরিণাম

একদা এক ব্রাহ্মণ বিশেষ কাজে গ্রামান্তরে যাচ্ছিলেন। পথেই পড়ে এক প্রকাণ্ড প্রান্তর। এই প্রান্তরের একদিকে অরণ্য। কোথাও জনমানবের চিহ্ন নেই। প্রান্তরে পা দিয়েই ব্রাণের গা ছমছম করে ওঠে। কোনােরকমে এটি পার হতে পারলে যেন বাঁচা যায়। ব্রাহ্মণ তার চলার গতি বাড়িয়ে দেন। তবু যেন মনে হয় পা এগােয় না। তাই নিজের পা দুটিকে মনে মনে বলেন—জোরে, আরও জোরে, আরও জোরে। একসময় ব্রাহ্মণ প্রায় ছুটতে শুরু করেন। হঠাৎ প্রান্তর-সংলগ্ন অরণ্য থেকে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে কেউ বলে ওঠে, ঠাকুর, এত ব্যস্ত কেন? কীসের এত তাড়া?

ব্রাহ্মণ চমকে তাকিয়ে দেখেন একটি বাঘ। সে-ই তাকে বলেছে একথা। বাঘটির বেশবাস তাে অদ্ভুত! গায়ে নামাবলি, কপালে দীর্ঘ তিলক। তার হাতে ধরা দুটি সােনার বালা। ব্রাহ্মণের বুকটা ছ্াৎ করে উঠল, আড়ষ্ট হয়ে গেল পা। মুখ দিয়ে কোনাে কথা বেরােল না। ভয় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটু কৌতূহলও হল। সত্যিই অদ্ভুত ব্যাপার! গায়ে নামাবলি জড়ানাে বাঘ তাে কখনও দেখেননি! কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, এখন তিনি এই সাক্ষাৎ যমের হাত এড়িয়ে পালাবেন কী করে? বাঘের সঙ্গে দৌড়েও তাে পেরে ওঠা মুশকিল। ব্রাহ্মণের এইসব সাত-পাঁচ ভাবনার মধ্যেই বাঘ আবার কথা বলে উঠল—ঠাকুরমশাই, ভয় পাবেন না, আমার কাছে আসুন। আমার একটি পা ভাঙা, নড়তে চড়তে পারি না। না হলে আমি নিজেই আপনার কাছে যেতাম। আপনার মতাে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণকে দেখলেও পুণ্য হয়।

এবার ব্রায়ণের মনে কিছুটা সাহস এল। যাক, বাঘটার পা যখন ভাঙা তখন আর খুব একটা ভয় নেই। তাড়া করে তাে ধরতে পারছে না। তাই একটু সাহস করে ব্রাহ়মণ বাঘের কাছে কিছুটা এগিয়ে গেলেন। বাঘ বলল, আমি বহুদিন থেকে নিরামিষাশী, ধর্মকর্ম নিয়ে থাকি। আজ সকাল থেকে আমার উপবাসব্রত। আমি সংকল্প করেছি কোনাে ব্রাহয়ুণের দেখা পেলে তাকে আমার এই বালা জোড়াটা দান করে উপবাসব্রত ভঙ্গ করব যাক, ভগবান আপনাকে এখানে এনে দিয়েছেন। এখন দয়া করে এই সােনার বালা দুটি গ্রহণ করে আমাকে পুণ্য অর্জনের সুযােগ দিন।

এটিও পড়ুন – জাতিপুঞ্জের সাফল্যের কিছু দিক উল্লেখ করাে।

সােনার বালা দুটি দেখে ব্রাহ্মণের মনের মধ্যে লােভ জেগে উঠল। কিন্তু বাঘের কথায় পুরােপুরি বিশ্বাস আছে কী? ব্রাহ্ণ বলল, সত্যিই কী তুমি বালা দুটি আমাকে দিতে চাও? বাঘ অত্যন্ত বিনীত কণ্ঠে জানাল, আমার দুর্ভাগ্য যে আমি বাঘ হয়ে জন্মেছি। তাই আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। কিন্তু ভগবানের নামে শপথ করে বলছি, আমি জীবনে কোনােদিন মিথ্যা কথা বলিনি।

ব্রাহ়ুণ আর একটু এগিয়ে গেলেন কিন্তু বাঘের ধরাছোঁয়ার বাইরে রইলেন। বাঘকে বললেন, বেশ যদি তুমি দিতেই চাও তাহলে ওখান থেকে ছুঁড়ে দাও বালা দুটো।

বাঘ বলল, তা কী হয়? আমি নিজের হাতে আপনার হাতে তুলে দেব। তবেই তাে আমার পুণ্যলাভ হবে। দূর থেকে ছুঁড়ে দিলে কি দান করা হয়? আপনিই বলুন।

ব্রাত্মণ নিজের অজান্তেই আর একটু এগিয়ে গেলেন। তাঁর মনের মধ্যে একই সঙ্গে লােভ আর ভয়ের দ্বন্দ্ব চলতে লাগল। কখনও ভাবেন, বাঘকে বিশ্বাস নেই, কখনও ভাবেন সােনার বালা দুটি হাতছাড়া করা কী ঠিক হবে?

বাঘ তার কণ্ঠস্বরকে আরও বিনীত করে বলল, ঠাকুরমশাই আপনি এখনও আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না? আপনার কোনাে ভয় নেই, আপনি আর একটু এগিয়ে আসুন। দয়া করে বালা দুটি নিয়ে যান।

এবার ব্রাহ্মণের লােভ তীব্র হয়ে উঠল। ভাবলেন, বাঘের পুণ্য হােক বা না হােক, এরকম সােনার বালা ছেড়ে দেওয়া যায় না।

ব্রাক্ষ্মণ দু-পা এগিয়ে গিয়ে বাঘের সামনে তার দুটি হাত প্রসারিত করে দাঁড়ালেন। বাঘও অমনি বালা দেবার ভঙ্গি করে মহর্তের মধ্যে তার থাবা বসিয়ে দিল ব্রাহ়ণের শরীরে। তারপর? তারপর মহানন্দে বাঘ ভঙ্গ করল তার উপবাসব্রত।

Leave a Reply