জীবনের হিসাব গল্প

জীবনের হিসাব (সংকেত-সূত্র): এক পণ্ডিত নৌকোয় নদী পার হচ্ছেন—মাঝি লেখাপড়া শেখেনি শুনে পণ্ডিত বলেন মাঝির জীবন আট আনাই ব্যর্থ-মাঝনদীতে নৌকো গেলে ঝড় ওঠে। মাঝি বলে, নৌকো ডুবলে সে সাঁতরে প্রাণ বাঁচাবে—ভীত পণ্ডিত বলেন, তিনি সাঁতার জানেন না—মাঝির মন্তব্য পণ্ডিতের জীবন যােলাে আনাই বৃথা।

জীবনের হিসাব

দুর্গাচরণ তর্করত্ন যেমন পণ্ডিত তেমনি দাস্তিক। সবাইকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা তার স্বভাব। দিনরাত পুথিপত্র নিয়ে বসে থাকেন, গ্রামের মানুষজনের সঙ্গে যােগাযােগও তাঁর বড় কম। মাঝে মাঝে শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে ডাক এলে তবেই তিনি বাড়ির বাইরে যান।

আজ তর্করত্নমশায় চলেছেন মনােহরপুর গ্রামে। ওখানে তিনকড়িবাবুর বাড়িতে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। তর্করত্নের গ্রাম রাধানগর থেকে মনােহরপুর যেতে হলে নদীপথে যাওয়াই শ্রেয়। সকলেই তাই যায়। ঘাটে তারিণী মাঝির নৌকা বাঁধাই ছিল। তর্করত্ন সেই নৌকায় উঠে বসলেন। তারিণীকে বললেন, চল, মনােহরপুর যাব।

নৌকা ছেড়ে দিলে তারিণী বলল, বাবাঠাকুর, মনােহরপুরে কী ছেরাদ্দ না যগ্যি? কী আছে? আপনি তাে এমনি এমনি যাবেন না?

তর্করত্নমশায় খেঁকিয়ে ওঠেন, অ্যা, কী বললি, ছেরাদ্দ, যগ্যি? তাের কথাবার্তা এত অশুদ্ধ কেন? শ্রাদ্ধ, যজ্ঞ বলতে পারিস না? আমরা কি আর লেখাপড়া শিখেছি বাবাঠাকুর? আমরা কথা বলতে হয় বলি। ভুল হলে মাপ করে দেবেন।

তর্করত্ন বলেন, সে ব্যাকরণ পড়িসনি? কাব্য পড়িসনি? ন্যায় পড়িসনি?

তারিণী নৌকা চালাতে চালাতে সবিনয়ে জানায়, না, বাবাঠাকুর, আমি নেকাপড়া কিছুই জানি না।

মুখের মধ্যে কীরকম একটা অদ্ভুত শব্দ করেন তর্করত্ন। তারপর প্রবল তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেন, তারিণী, লেখাপড়া যখন শিখিসনি, তখন তাের জীবনটা তাে আট আনাই ব্যর্থ। তুই তাে আধখানা মানুষ।

তারিণী ঘাড় নাড়ে, তা হবে।

লেখাপড়া না জানার জন্য তারিণীর জীবনটা কীভাবে একটা ফাকিতে পরিণত হয়েছে, সেকথাই বড় বড় কঠিন সংস্কৃত শ্লোকসহ তর্করত্নমশায় তারিণীকে বােঝাতে শুরু করলেন। তারিণী কখনও ‘ই’ ‘হ’ করে, কখনও চুপ করে থাকে।

এমন সময় আকাশে দেখা গেল কালো মেঘ। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘে আকাশ ঢেকে গেল। তারিণী বােঝে এই মেঘের মর্ম। সে বলে, বাবাঠাকুর, মনে হয় ঝড় উঠবে।

নৌকা তখন মাঝনদীতে। শুরু হয়ে গেল ঝড়। নৌকা টলমল করতে লাগল। তর্করত্নের মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেছে। তারিণী জিজ্ঞেস করে, বাবাঠাকুর, সাঁতার জানেন তাে? নৌকা ডুবে গেলে সাঁতার দিয়ে ওপারে পৌঁছােতে হবে।

তর্করত্ন আতঙ্কিত মুখে বলেন, না রে, আমি যে সাঁতার জানি না।

তারিণী বলে, সে কী, সাঁতার জানেন না? নৌকা ডুবলে আমি তাে সাঁতরে ওপারে চলে যাব। কিন্তু আপনি জীবন বাঁচাবেন কী করে? নেকাপড়া না জানার জন্যে আমার জীবনের আট আনা নষ্ট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সাতার না জানার জন্যে আপনার জীবনের যে সবটাই ফাকি বাবাঠাকুর। source: internet

1 comment on জীবনের হিসাব গল্প

Leave a Reply